“বিশ বছর। দুইশো চল্লিশ মাস।
প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট দিনে তিনি টাকা পাঠিয়েছেন। ঈদে পাঠিয়েছেন বেশি। কেউ অসুস্থ হলে ধার করে পাঠিয়েছেন।
তারপর একদিন শরীর আর চলল না। তিনি দেশে ফিরলেন।
আর ফেরার এক মাসের মাথায় বুঝলেন, যে বাড়িটা তাঁর টাকায় উঠেছে, সেই বাড়িতে তাঁর নিজের কোনো ঘর নেই। যে জমি তাঁর টাকায় কেনা, সেই দলিলে তাঁর নাম নেই। আর যে পরিবারের জন্য তিনি বিশ বছর দিয়েছেন, সেই পরিবার এখন প্রশ্ন করে, ‘আর কতদিন বসে খাবেন?’
আসসালামু আলাইকুম। ‘প্রবাসের সংলাপ’-এ আপনাকে স্বাগতম।
যাঁদের ঘামে চলে দেশের অর্থনীতি, অথচ যাঁদের কথা সবচেয়ে কম শোনা হয়, এই অনুষ্ঠান তাঁদের জন্য। প্রবাসীর সংগ্রাম, অধিকার আর সম্ভাবনার কথা আমরা বলি তথ্য দিয়ে, সত্য দিয়ে।
আজকের বিষয়: খালি হাতে ফেরা প্রবাসী। সারাজীবন আয় করেও কেন অনেকে শেষ বয়সে নিঃস্ব হয়ে ফেরেন, আর আপনি কীভাবে এই পরিণতি এড়াবেন।
যে গল্পটা দিয়ে শুরু করলাম, সেটা কোনো একজন মানুষের না। এটা হাজারো প্রবাসীর অভিজ্ঞতা মিলিয়ে বানানো একটা ছবি। চলুন তাঁর একটা নাম দিই। করিম। করিম যখন প্রথম বিদেশ যান, বয়স ছিল বাইশ। বাবার জমি বন্ধক রেখে, দালালকে টাকা দিয়ে।
প্রথম তিন বছর গেল দেনা শোধ করতে। তারপর ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা। তারপর বোনের বিয়ে। তারপর বাড়ি পাকা করা। তারপর নিজের সন্তানদের স্কুল। প্রতিবার ফোনে করিম শুনেছেন, ‘আর একটু কষ্ট করো, এবারই শেষ।’ ‘এবার’ কখনো শেষ হয়নি।
আর একটা জিনিস করিম কখনো করেননি: নিজের জন্য কিছু রাখা। কারণ তাঁর মনে হতো, পরিবারের জন্য পাঠানো মানেই নিজের জন্য রাখা। এবার গল্প থেকে বাস্তবে আসি।
করোনার সময় ব্র্যাক দেশে ফেরত আসা পাঁচশোর বেশি প্রবাসীর ওপর একটা জরিপ করেছিল। দেখা গেছে, তাঁদের চৌত্রিশ শতাংশের কোনো সঞ্চয়ই ছিল না। আরও উনিশ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের সঞ্চয় দিয়ে বড়জোর দুই মাস চলবে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের আরেক জরিপে দেখা গেছে, বিদেশফেরত প্রবাসীদের পঞ্চান্ন শতাংশের মাথায় ছিল অপরিশোধিত ঋণ। ভাবুন একবার। বছরের পর বছর বিদেশে আয় করে ফিরে এসে মাথায় ঋণের বোঝা।
আর নারী প্রবাসীদের অবস্থা আরও কঠিন। বিদেশফেরত নারী কর্মীদের নিয়ে এক গবেষণায় সতেরো শতাংশ জানিয়েছেন, ফেরার পর পরিবারের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত খারাপ আচরণ পেয়েছেন। আঠাশ শতাংশ পড়েছেন দাম্পত্য সমস্যায়। এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে, যেখানে দশ বছর টাকা পাঠানোর পর পরিবার সামাজিক লজ্জার ভয়ে সেই নারীকে ঘরে নিতেই রাজি হয়নি।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এত টাকা যায় কোথায়? প্রথম কারণ: পরিবারের অসীম প্রত্যাশা। গ্রামে একজন প্রবাসীর পরিবারকে সবাই ধনী মনে করে। আত্মীয়, প্রতিবেশী, সমাজ, সবার চাহিদা বাড়তে থাকে। আর প্রবাসী নিজেও লজ্জায় বলতে পারেন না, ‘আমার কাছে এখন নেই।’
দ্বিতীয় কারণ: সব কিছু অন্যের নামে। প্রবাসী বিদেশে থাকেন, তাই জমি কেনা, বাড়ি বানানো, ব্যাংকে টাকা রাখা, সব হয় বাবা, ভাই বা স্ত্রীর নামে। বিশ্বাস থেকেই করা হয়। কিন্তু ফেরার পর সেই বিশ্বাস সবসময় টেকে না।
তৃতীয় কারণ: কোনো পরিকল্পনা নেই। বেশিরভাগ প্রবাসী যাওয়ার দিন থেকে ফেরার দিন পর্যন্ত একটাই কাজ করেন: আয় করা আর পাঠানো। কিন্তু ফেরার পর কী করবেন, সেই প্রশ্ন নিজেকে কখনো করেন না।
চতুর্থ কারণ: রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি। কাগজে-কলমে ফেরত আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসনের কথা আইনে আছে। কিন্তু বাস্তবে সেটা খুব কম মানুষের কাছে পৌঁছায়। করোনার সময় সরকার পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ তহবিল দিয়েছিল, কিন্তু একটা গবেষণা অনুযায়ী তার আওতায় এসেছিলেন মাত্র দুই শতাংশ প্রবাসী।
তবে পুরো ছবিটা এত অন্ধকার না। আর এখানেই আসল শিক্ষাটা লুকিয়ে আছে।
দুইশো সত্তর জন ফেরত আসা প্রবাসীর ওপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, চুয়াত্তর শতাংশ অন্তত এক লাখ টাকা সঞ্চয় নিয়ে ফিরেছেন। আর আশি শতাংশের বেশি গ্রামে ব্যবসা শুরু করতে চান। ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, কিছু উপজেলায় ফেরত আসা প্রবাসীদের অর্ধেকের বেশি তাঁদের সঞ্চয় ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। সেখানে প্রতি তিনটা নতুন ব্যবসার একটা শুরু করেছেন ফেরত আসা প্রবাসীরা। মানে সবাই খালি হাতে ফেরেন না। যাঁরা পরিকল্পনা করেছেন, নিজের জন্য কিছু রেখেছেন, তাঁরা ফিরে এসে দাঁড়াতে পেরেছেন।
পার্থক্যটা আয়ে না। পার্থক্যটা পরিকল্পনায়। তাহলে আপনি কী করবেন? আজ থেকেই ছয়টা কাজ শুরু করুন।
এক, প্রতি মাসের আয় থেকে একটা নির্দিষ্ট অংশ নিজের জন্য আলাদা রাখুন। যত কমই হোক, প্রতি মাসে। দুই, নিজের নামে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলুন, যেটায় শুধু আপনার সঞ্চয় যাবে, সংসারের খরচ না। তিন, জমি বা বাড়ি কিনলে অন্তত নিজের নামে, বা যৌথ নামে রাখুন যাতে আপনার নামও থাকে। ভালোবাসা আর দলিল দুটো আলাদা জিনিস। চার, সরকারের সর্বজনীন পেনশন স্কিমে প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাস’ নামে আলাদা একটা স্কিম আছে। নিয়মিত চাঁদা দিলে বয়স হলে মাসে মাসে পেনশন পাবেন। বিস্তারিত দেখে নিন upension.gov.bd ওয়েবসাইটে। পাঁচ, ফেরার অন্তত দুই বছর আগে থেকে ঠিক করুন, ফিরে কী করবেন। দরকার হলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের পুনর্বাসন ঋণের খোঁজ নিন। ছয়, আর সবচেয়ে কঠিন কাজটা: পরিবারের সাথে খোলামেলা কথা বলুন। কত আয় করেন, কত পাঠাতে পারবেন, আর নিজের ভবিষ্যতের জন্য কত রাখছেন। ‘না’ বলতে শেখা স্বার্থপরতা না। এটা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
শেষ করার আগে করিমের কথায় ফিরি। করিম কোনো ভুল মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন ভালো ছেলে, ভালো ভাই, ভালো বাবা। তাঁর একটাই ভুল ছিল: তিনি সবার কথা ভেবেছেন, শুধু নিজের কথা ছাড়া। আপনি যখন পরিবারের জন্য টাকা পাঠান, মনে রাখবেন, বিশ বছর পরের যে মানুষটা দেশে ফিরবে, সেও আপনার পরিবারের একজন সদস্য। তার জন্যও কিছু রেখে দিন।
**তথ্যসূত্র**
– **ব্র্যাক জরিপ (২০২০, করোনাকাল):** ৫৫৮ জন ফেরত আসা প্রবাসীর মধ্যে ৩৪% এর কোনো সঞ্চয় ছিল না, আর ১৯% বলেছেন সঞ্চয়ে দুই মাস চলবে। [ঢাকা ট্রিবিউন](https://www.dhakatribune.com/bangladesh/210667/brac-87%25-returnee-migrants-struggling-financially)
– **আইওএম জরিপ (২০২০):** বিদেশফেরতদের ৫৫% এর অপরিশোধিত ঋণ জমেছিল। [সাউথ এশিয়া মনিটর](https://www.southasiamonitor.org/bangladesh/70-migrants-returning-bangladesh-struggle-find-employment-survey)
– **নারী প্রবাসী (বিলস গবেষণা):** ৩৮% জানিয়েছেন সমাজ তাঁদের চরিত্রহীন ভাবে, ২৮% দাম্পত্য সমস্যায় পড়েছেন, ১৭% পরিবারের অপ্রত্যাশিত আচরণের মুখোমুখি হয়েছেন। [ডেইলি স্টার](https://www.thedailystar.net/slow-reads/unheard-voices/news/what-the-government-can-really-do-returnee-women-migrants-4156866)
– **পুনর্বাসন তহবিলের আওতা:** সরকার বিশেষ পুনর্বাসন তহবিল দিলেও মাত্র ২% প্রবাসী এর আওতায় এসেছিলেন। [পিএমসি গবেষণা](https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC9749054/)
– **সঞ্চয় নিয়ে ফেরা ও ব্যবসা:** ২০২৪ সালের জরিপে কিছু উপজেলায় ৫৪.৩% ফেরত আসা প্রবাসী সঞ্চয় ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন, আর প্রতি তিনটি নতুন ব্যবসার একটি তাঁদের। ২৭০ জনের এক গবেষণায় ৭৪% অন্তত এক লাখ টাকা সঞ্চয় নিয়ে ফিরেছেন, ৮০% এর বেশি ব্যবসা করতে চান, কিন্তু জামানত, নীতিগত স্বীকৃতি আর প্রশিক্ষণের অভাব বাধা। [ডেইলি স্টার](https://www.thedailystar.net/opinion/views/news/returnee-migrant-capital-investment-boom-hidden-plain-sight-4019286)